আজ পবিত্র শবে বরাত বরকতময় এ ভাগ্যরজনী রাত

——কাজী মোরশেদ আলম——

শবে বরাত রাত্রিটি নিয়ে এক শ্রেণির নামে মাত্র মুসলমানরা অপ্রীতিকর যেসব মন্তব্য করে যাচ্ছে যা সত্যিই দুঃখজনক। শবে বরাত পালন করা কোনো মতেই অযৌক্তিক নয়। শবে বরাত একটি সম্মানি রাত। বরকতময় এ ভাগ্যরজনী থেকে কোনোমতেই বাদ হওয়া যাবে না, তা পালন করতে হবে। হাদিসে আছে কিন্তু কোরআনে নেই শবে বরাত সম্বন্ধে। তাই বলে এ রাত্র পালন করা যাবে না তা অযৌক্তিক।

আমাদের সমাজে এক শ্রেণির লোক আছে তারা কোরআনকেই শুধু প্রাধান্য দেয়। অনেক হাদিসকে তারা প্রাধান্য দেয় না। এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোরআনের পরই হাদিসের স্থান। হাদিসে যা বলা হয়েছে তা অবশ্যই পালন করতে হবে। শবে বরাত নিয়ে অনেক হাদিস আছে। কাজেই হাদিস অনুসারে আমাদের ইবাদত বন্দেগী করা হলে কোনো মতেই তা দোষের নয়। তাছাড়া সময় থাকলে নফল নামাজ, কোরান পাঠ, হাদিস পাঠ করা যেতেই পারে। যতই করা হবে ততই পূণ্য হবে। কাজেই তা নিয়ে বিরূপ মাতামাতি করা ঠিক নয়। শবে বরাতের কথা কোরআনে না থাকলেও হাদিসে আছে। কাজেই শবে বরাত বাতিল করা যাবে না। মুখে দাড়ি রাখতে হবে তা নিয়ে কোরআনে উল্লেখ নেই। কিন্তু হাদিসে আছে। কাজেই হাদিস অনুযায়ী আমরা দাঁড়ি রাখি।

আর দাঁড়ি রাখাতো অবশ্যই সুন্নত। তাহলে কোরআনে নেই বলে তা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে যাবো, তা হবে না। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যা বলেছেন তা মানতে হবে। বিদায় হজে¦র ভাষণে হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, কোরআন ও হাদিসকে আকড়ে ধরে রাখার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু লোক আছে তারা রাজনীতি করে কোরআন নিয়ে কিন্তু হাদিসকে মানতে নারাজ। আর এই শ্রেণির লোকেরা শবে বরাত পালন করছেনা। যাহোক পালন না করলে করার কিছু নেই। কিন্তু যারা এই রাতে নামাজ পড়ে, জিকির আজকার করে তাদেরকে নিয়ে মন্তব্য করা কোনোমেই ঠিক নয়। তারা হাদিসকে অনুসরণ করে শবে বরাতকে প্রাধান্য দিচ্ছে, ইবাদত বন্দেগী করে পূণ্য অর্জন করছে কিন্তু তাদের নিয়ে অশোভনীয় কথা বার্তা বলা ঠিক না।

শবে বরাতে বাজি ফটকা বাজানো তা অনেকাংশে কমে গেছে। অবশ্য এসব কুসংস্কার। এসব প্রতিবন্ধকতা অনেক হ্রাস পেয়েছে। এ রাতে মুসলমানরা ভালো খাবার খায় তাতে বাধা দেওয়া ঠিক হবে না। আয় অনুসারে ভালো খাবার খাবে তা খাক। তাতে মন্দের কিছু নেই। আল্লাহতায়ালা অবশ্যই পূণ্যে ভরে দেবেন শবে বরাতকে গুরুত্ব দিয়ে যারা ফরজের বাইরেও নামাজ রোজা করে থাকেন। আমরা দেখিছে এ রাতে ওয়াজ মাহফিল হয়, ঘরে বাইরে মানুষ ইবাদতে লিপ্ত থাকে তা বাধা দেওয়া এবং এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা ঠিক নয়।  হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) সুরা দুখান ১-৪ আয়াতে লাইলাতুল মুবারাকাহ’ ব্যাখ্যায় বলেন, ‘হামীম’ অর্থ আল্লাহর ফয়সালা, যা কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিত হবে।

’’ আল-কিতাবুল মুবীন অর্থ আল কুরআন আর ‘লাইলাতুল মুবারাকাহ’ হলো শাবান মাসের অর্ধেক রাত। এরাতটি হলো লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত। ‘লাইলাতুল মুবারাকাহ’ নিয়ে সাহাবীদের মাঝে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। কেউ বলেন লাইলাতুল ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, লাইলাতুল শাবানকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এ রাতে প্রতিটি বস্তুর হিকমতপূর্ণ ফায়সালা হয়ে থাকে।’’ তিনি আরো বলেন, এক রাতে আমি হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে হারালাম, কোথাও তাঁকে খুঁজে পাচ্ছি না। ঘর থেকে বের হয়ে দেখলাম জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে অবস্থান করছেন।

তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি ভয় পাচ্ছ যে আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার ওপরে অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি আপনার কোনো স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করেছেন, অতঃপর তিনি বলেন নিঃসন্দেহে আল্লাহাতায়ালার রহমত ও ফেরেশতা অর্ধ শাবানের রাতে পৃথিবীর আশপাশে অবতীর্ণ হন এবং বনু কালবের মেষপালের পশম পরিমাণের চেয়েও অধিক পরিমাণে তার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী খ. ১, ) তাহলে বলা যায় যে, শাবানের রাতে মর্যাদা অনেক অনেক। যদিও আমাদের দেশে কিছু আলেম রাজনীতি করে তারা হাদীস উপেক্ষা করে রাজনীতির মাঠে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছেন।

এসব জঞ্জাল থেকে মুক্তি পেতে তাদের থেকে অবশ্যই হেফাজতে থাকতে হবে। আবার কেউ কেউ ফেইসবুকে বহুরূপী মন্তব্য করেন এ রাত নিয়ে। আমাদের সাবধানে থাকতে হবে সকল দিক থেকে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) বলেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসবে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। ইবনে মাযাহ পৃ. ৯৯)। আমাদের অনেকের পিতা-মাতা ও আত্মীস্বজন চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। আমরা যে কোনো সময় মন চাইলে কবর জিয়ারত করতে পারি। কবর জিয়ারত দোষের নয়। এই রাতে কবর জেয়ারতের কথা উল্লেখ আছে, কেউ যদি করে ভালো আর না করলে নাই। আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে শবে রবাত রাতে জান্নাতুল বাকীতে দেখা গেছে। তিনি কবরস্থানে উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন। শবে বরাতে কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব বলে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেব বলেছেন।

(যাওয়ালুস সুন্নাহ পৃ. ১০)  যেসকল ব্যাক্তি শবে বরাত নিয়ে অযথা কথা বলেন তাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছি যে, আপনারা ভালো হয়ে যান। হাদীস অনুসরণ করুন। রাজনীতি করেন কিসের জন্য?  ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাই না? তাহলে শবে বরাত নিয়ে কূটক্তি করবেননা। এই রাতে যদি ১০০ রাকাত বা তার চেয়ে বেশি নফল নামাজ আদায় করে, ওয়াজ নসিহত করে তাহলে তা দোষের নয়। কতিপয় ইসলামের নামে রাজনীতি ব্যক্তি বলেন, এই রাত সম্বন্ধে কোরআনে কোনো উল্লেখ নাই। কাজেই এই রাত নিয়ে এতো মাতামাতি কেনো? কোরআনে নেই কিন্তু হাদিসে আছে তাহলে হাদিস বাদ দিতে চাচ্ছেন কেনো? বিদায় হজে¦র ভাষণে আমাদের নবী কী বলেছেন? তা কী নেই স্বরণে? আসলে আপনারা রাজনীতির দোহাই দিয়ে ইসলামের ক্ষতি করছেন।

এ রাতের ফজিলত সহি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কাজেই আবোল তাবোল বলবেন না। বেশ কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ রাত মর্যাদাপূর্ণ রাত। কাজেই এ রাতকে অবহেলা করা কোনোমতেই উচিত হবে না। অবশ্যই এ রাতের গুরুত্ব রয়েছে এবং তা স্বীকৃত। নবীর সুন্নাত থেকে দুরে রাখার জন্য যারা চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা ইসলামের নামে নতুন ধর্ম গঠন করতে চায়। আজ দেশের বুকে কয়েকটি দল আছে তারা ইসলামের নাম নিয়ে ক্ষতি করছে। আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে উপেক্ষা করে মানুষ রোচিত আইন নিয়ে রাজনীতি করছে তাদের থেকে সাবধানে থাকতে হবে। শবে বরাত বলতে কিছু নেই যারা বলে থাকেন তারা হাদিস মানেন না। আর যারা হাদীস মানেন না তাদেরকে মুসলমান বলা যাবেনা। আমাদের গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে যে, যে সকল হাদিসে শবে বরাতের কথা উল্লেখ আছে তা ইসলাম বিরোধী কিনা এবং তা পালন করলে ইসলামের ক্ষতি হয় কিনা।

নিশ্চই ইসলামের ক্ষতি হয় না। বরঞ্চ ইবাদত বন্দেগী বেশি হচ্ছে। কাজেই শবে বরাত বলতে কিছু নেই যারা বলেন তারা মানুষ শয়তান। কোরআনের পর হলো হাদীস। আর এ হাদীসকে যারা অবজ্ঞা করে তাদের থেকে সাবধানে থাকতে হবে। বড় বড় সার্টিফিকেট নিয়ে বড়াই যারা করে তাদের জিহ্বাকে হেফাজত করার জন্য বলছি। কুরআনে নেই কিন্তু হাদিসে আছে। আর হাদীস অস্বীকার করা কোনো মতেই উচিত হবে না।  হাদীসে উল্লেখ আছে শবে বরাত পালনের প্রমাণ। অনেক বড় বড় সাহাবাদের কাছ থেকে জানতে পারি শবে বরাত পালনের কথা। আমরা কিতাবের মাঝে দেখতে পাই অনেক হাদীস আছে শবে বরাত পালনের গুরুত্বের কথা। এসব হাদীসে শবে বরাত পালনের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা দুখানের তাফসীর নিয়ে নানা মতবাদ লক্ষণীয়।

শবে বরাতকে প্রাধান্য দিয়ে ইবাদত বন্দেগী করে যাচ্ছে তা দোষের নয়। শবে বরাতের ফজিলত বর্ণনা করে এই রাতে অনেক বুজর্গ ইবাদতে মগ্ন থাকতেন বলে নানা কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহাবা, তাবেয়ীন, মুফাসসিরে কেরাম, মুহাদ্দিসীনসহ বড় বড় বুর্জুগানে দ্বীনরা শবে বরাত ফজীলত নিয়ে নানা ব্যাখা করেছে এবং পালন করেছেন। অনেক তাফসীরগ্রন্থে শবে বরাতের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। বড়পীর আব্দুল ক্বাদের জ¦ীলানী (রহ.), মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.)সহ আরো অনেক পীর আওলীয়া কুরআন-হাদীসের আলোকে শবে বরাত পালন করে গেছেন। শবে বরাত রাতে আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করে দেন এ বিশ^াস করা অযৌক্তিক নয়।

শুধু শবে বরাত কেনো যে কোনো সময় আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, আল্লাহকে মানতে হবে, পাঁচ স্তম্ভ পালন করতে হবে। শবে বরাত একটি পবিত্র রাত। এই রাতে এবাদত বন্দেগী বেশী করে করা হলে পূণ্য আমলে ভরে যাবে। যারা সৌভাগ্য রাত বলে মনে করেন দোষের কী আছে? অনেক হাদীসে এ রাতে বরকত ও ফযিলতের কথা উল্লেখ আছে। কাজেই শবে বরাত নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক মাতামাতি না করাই ভালো।  এ রাতে আমরা ইবাদত বন্দেগী করবো। মৃত আত্মীয়দের জন্য দুয়া করবো, কুরআন তেলাওয়াত করবো, দুয়া দুরুদ পড়বো, তাহসবী তাহালীল পালন করবো, কবর জিয়ারত করবো। মোট কথা ভালো কাজ করবো যাতে পরকালে শান্তিতে থাকতে পারি।

পরিশেষে বলা যেতে পারে শবে বরাতে রিজিক বণ্টন নয়। এমনকি ভাগ্যের রাতও নয়। প্রতিটি রাত ও প্রতিটিই দিনই ভাগ্যের রজনী ও ভাগ্যের রাত। আল্লাহর কাছে যে কোনো সময় প্রার্থনা করলে আল্লাহ কবুল করেন। যাহোক শবে বরাত আমাদের দেশে বা অন্যান্য দেশে পালিত হয়ে আসছে। আবি হুমাইরাহ বাইতুল মুকাদ্দাসে সর্বপ্রথম ৪৪৮ হিজরীতে শবে বরাত চালু করেন তা উল্লেখ আছে। যদিও কেউ কেউ তাকে বিদআত সৃষ্টিকারী বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু আমরা বিদআতের দিকে না গিয়ে এ রাতে ওয়াজ মাহফিল, নফল নামাজ, জিকির আজকার করবো বেশি করে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য।

কাজী মোরশেদ আলম (এম.এ.বি.এড.ডি.এইচ.এম.এস)

প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক হাজীগঞ্জ ও হৃদয়ে চাঁদপুর।

হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।

জনপ্রিয় খবর

সর্বশেষ খবর

দিনপঞ্জিকা

September 2021
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

আর্কাইভস